খালেদার মুক্তি আন্দোলন জোরালো করবে বিএনপি

রাজনীতি

রোজার ঈদের পর বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরালো করবে বিএনপি। রমজানের কারণে নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে তাদের নেত্রীর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার রয়েছেন। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এখন প্রায় প্রতিদিনই মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। জানা গেছে, ঈদের পর বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে আরো সঙ্ঘবদ্ধ হবে দলটি। বিক্ষোভ সমাবেশ, অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধনের মতো লাগাতার কর্মসূচিরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, বেগম জিয়ার মুক্তি ছাড়া চলমান সঙ্কট কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। ওই নেতা রাজনৈতিক সঙ্কটের পাশাপাশি দলের ভিতরের সঙ্কটকেও বুঝিয়েছেন। 

দীর্ঘ সাড়ে ১৫ মাসেও দলের কারাবন্দী চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্ত না হওয়ায় দারুণ উদ্বিগ্ন ও অনুতপ্ত বিএনপির হাইকমান্ড। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দলীয় চেয়ারপারসনকে মুক্ত করতে তাদের যেটা করার দরকার ছিল সেটা তারা করতে পারেননি। অচিরেই দল পুনর্গঠন করে জনসম্পৃক্ত কঠোর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার কথা বলছেন তারা। যদিও দলটির নেতাকর্মীরা ভেবেছিলেন, হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বিএনপির এমপিদের সংসদে যোগ দেয়ার নেপথ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি জড়িত রয়েছে। কিছুদিন ধরে রাজনীতিতে এমন জোরালো গুঞ্জনের প্রেক্ষাপটে দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে বিএনপির পক্ষ থেকেও তেমন কোনো কর্মসূচি দিতে দেখা যায়নি। রাজপথের কঠোর কর্মসূচির পরিবর্তে ঘোষিত নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকেও সরে যায় দলটি। আর বিএনপি সংসদে গেলেও বেগম জিয়ার মুক্তির কোনো লক্ষণ দেখতে না পাওয়ায় দলটির নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি ইস্যুতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া বিএনপি হঠাৎ করে রমজানের মধ্যে বিক্ষোভ-মিছিলের মাধ্যমে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। 

খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, দলীয় প্রধানের মুক্তির আন্দোলন এখন সারা দেশের নেতাকর্মীদের দাবি। বিষয়টি নিয়ে তারা আন্দোলনের মধ্যেই আছেন। সংগঠন গুছিয়ে এই আন্দোলনকে আরো জোরদার করা হবে। 
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এবার বিএনপির ইফতারকেন্দ্রিক সাংগঠনিক তৎপরতা তেমন একটা নেই। জমেনি ইফতার রাজনীতিও। দলটির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দুটি ইফতার মাহফিল দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ২৮ মে রাজনীতিবিদদের সম্মানে একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হবে। তবে রমজানে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি নিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন মাঠে রয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে বিক্ষোভ মিছিলের পাশাপাশি মানববন্ধনের মতো নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও অব্যাহত রেখেছে তারা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলের এক নেতা বলেন, নেতাকর্মীরা রাস্তায় নামার ভীতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছেন কারণ, ঈদের পরে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন আরো বেগবান করবে বিএনপি। 

বিএনপির শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে পরিচিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপিকে রাস্তায় নামতে হবে। ঘরে বসে শুধু সভা-সেমিনারে কাজ হবে না। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে নামছেন। স্বল্প পরিসরে হলেও ঘর থেকে তারা রাজপথে নেমেছেনÑ এটাকে সাধুবাদ জানাই। তবে তাদেরকে বৃহৎ পরিসরে রাজপথে নামতে হবে। বিএনপির প্রতিটি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি ঢাকা মহানগরের ১০০টি ওয়ার্ড থেকেও মিছিল বের হতে হবে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকেও রাস্তায় নামতে হবে। তাহলে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি আরো জোরালো হবে। তখন সরকারও বিষয়টি বিবেচনায় নিতে বাধ্য হবে। এ কাজটি বিএনপিকে করতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে, দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির ব্যাপারে তারা আন্তরিক। ডা: জাফরুল্লাহ আরো বলেন, বিএনপির উচিত খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনায় বসা। তার জামিনে যাতে বাধা দেয়া না হয়, তাকে যেন আর হয়রানি করা না হয়- এটা নিয়ে একটা আলোচনা হওয়া দরকার। সেটা করা সম্ভব হলে লাভটা বিএনপিরই বেশি হবে। 

জিয়া এতিমখানা ও দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত ৭৪ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে রয়েছেন। চিকিৎসার জন্য গত ১ এপ্রিল তাকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। তার রোগমুক্তি এবং কারামুক্তির জন্য সর্বশেষ গত ৭ এপ্রিল অনশন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। এই ইস্যুতে দলটি আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মানববন্ধন, কালো পতাকা প্রদর্শন, স্মারকলিপি প্রদান, অনশন, অবস্থান, গণস্বাক্ষর ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মতো শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করে। এখন সংগঠন গুছিয়ে রাজপথের কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার কথা বলে আসছেন তারা। এ লক্ষ্যে সংগঠন পুনর্গঠনের কাজও শুরু করেছে দলটি। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করতে চায় বিএনপি। 

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, শুধু আইনি প্রক্রিয়ায় এখন আর খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। কারণ, আইনি প্রক্রিয়ায় যা যা করা সম্ভবÑ তাদের আইনজীবীরা গত সাড়ে ১৫ মাসে তার সব কিছুই করেছেন। এখন সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া শিগগিরই বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। সরকারকে চাপ দিতে হলে রাজপথেই নামতে হবে।